কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -১৭

(কিশোরী কন্যা)-কেবল মাত্র এই রোদেই উড়তে পারি। এই তো সেদিন, এক পাখির শিকারের মুখে পড়েছিলাম। ভাগ্যিস বেঁচে গেলাম কোনো এক ঝোঁপ ঝাড়ে লুকিয়ে ছিলাম বলে।’

প্রজাপতির কথায় আমার ধারণাটা বদলে যায়। অপনি যতই সুন্দর হই না কেন, কোনো সুন্দরই সুন্দরের কাছে সুন্দর নয়। সম্ভাবত প্রত্যেক সুন্দরই ভিতরে ভিতরে অসুন্দর বোধকরে।

আমরা মানুষ হয়েছি তাই আমাদের পাখি হতে ইচ্ছে হয় আবার যারা পাখি প্রজাপতি হয়েছে তাদের মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণী হতে ইচ্ছে হয়। বস্তুত আমাদের এই ইচ্ছে ঘুড়িটা সুতো ছিড়ে আকাশে উড়তে থাকে। আর আমরা উড়ার চেষ্টা করি আমাদের এই ইচ্ছে ঘুড়ির পিছু পিছু।

কিশোরী কন্যা - মাফিজুল ইসলাম পর্ব -১৭
কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -১৭

যাহোক, আকাশের মেলা যে এত সুরভীত তা আগে কখনো ভাবিনি। হঠাৎ শরীরটা কাঁপতে থাকে। মনেহচ্ছে পড়ে যাচ্ছি। হ্যাঁ ঠিকই তো পড়ে যাচ্ছি। চিৎকার দিতে চাচ্ছি কিন্তু ভয়ে মুখ দিয়ে আওয়াজ আসছে না।

চোখ বুজে আছি। চোখ খুলে দেখি আমি ঠিকই আছি। আমি আকাশের কোনো মেলায় নয়। আমি বিছানায় শুয়ে আছি। বুকটা ধড়ফড় করছে! কী দেখেছি ঠিক মনে করতে পারছি না। বিছানা থেকে উঠে ঢক ঢক করে পানি পান করি। খুব তাড়াতাড়িই চারদিকে ফর্সা হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠি। খুব ভোরে,(কিশোরী কন্যা)

(কিশোরী কন্যা)

শৌভিক ভাইয়া আমাদের জন্য খেজুরের রস নিয়ে আসে। শীতে কাঁপছি আর মুড়ি দিয়ে ঠাণ্ডা রস খাচ্ছি। বড়ই সুমিষ্টি এই খেজুরের রস!

শৌভিক ভাইয়াদের বাড়ির পশ্চিম পার্শে ফাঁকা জায়গায়, কিছু খড়-কুটো দিয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে। এই আগুন থেকে দু-চার হাত দূরে একটি গাভী বাঁধা রয়েছে। এটির কিছু দূর সামনে একটি এঁড়ে বাছুর বাঁধা। দুধলি আসলে বাছুরটা ছাড়া হবে। বাছুরটি বার বার তার মায়ের কাছে তার মাথাটি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এটির মা আদরে মাথা শুকছে আর জিহ্বা দিয়ে মাথা চাটছে। আমি বাড়ির কয়েক জন ছোট-ছেলে মেয়ের সাথে রোদ পোহাবার আসায় বসে আছি। শহরে প্রতিদিন সকালে চা-কফির কাপ নিয়ে বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে থাকি। কিন্তু আজ সুস্বাদু রস খেয়ে সূর্যের মৃদু হাসির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি।(কিশোরী কন্যা)

বেশ তো বেড়ানো হল। হাসি-গল্পে অনেক দিন চলে গেল। আর কত দিন? বাবা বার বার ফোন করছেন। আমাদেরকে ঢাকা ফিরতে হবে। বাবা একটু বাস্ত আছেন। তাই তিনি আমাদেরকে শৌভিক ভাইয়ার সাথে ঢাকা আসতে বলেছেন। আর দুই দিন পরে আমাদের সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হবে। মনে মনে

একটু ভয় পাচ্ছি পিছে যদি এ না পাই। আবার মনে মনে এটিও ভাবছি না, পরীক্ষা তো বেশ ভালোই নিয়েছি। তাছাড়া পরীক্ষা দিয়ে সকলের সাথে উত্তর মিলিয়েও দেখেছি। যাকগে, যা হয় হবে।

সে কথা না হয় এখন না-ই ভাবলাম। ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি ভাবলে বর্তমানের সুখ বিনষ্ট হবে। তাই পরীক্ষার ফলাফলের বিষয় খুব বেশি না ভাবাই শ্রেয়। কিন্তু মন তো আর কোনো নীতি কথা শুনবে না। কোনো টেনশন করতে না চাইলেও টেনশন মাথায় চেপে বসে।

ইদানিং রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর অভ্যাস হয়েছে। কিভাবে যে রাত ফুরিয়ে যায়

একদম টেরই পেলাম না।

খুব ভোরে রওনা দিতে হবে। সকাল সাতটায় গাড়ি ছাড়বে।

আমরা রাতেই কপড়-চোপড় গুছিয়ে রেখেছি।

ফুঁপি বাবার জন্য রাতে চিতই পিঠা তৈরি করেছেন।(কিশোরী কন্যা)

বাবা গ্রামের রসের পিঠা বেশ পছন্দ করেন!

আম্মু পিঠার সাথে কলাই শাক পছন্দ করেন।

কুপি তাই আম্মুর জন্য কলাই শাক রান্না করেছেন। ফুপি রাতে তৈরি কিছু চিতুই পিঠা গরম ভাতের উপর দিয়ে গরম করেছেন। সেখান থেকে আম্মু দু’চারটে পিঠা খেলেন।

কাক ডাকা ভোর।

একটি ভ্যান এসে বেল বাজাচ্ছে আর বলছে, ‘চাচিম্মা, শৌভিক ভাই বাড়িতে আছেন। সক্কালে আমারে ভ্যান নিয়ে

আসতি করছিল। আমার বুঝতে বাকি রইল না এবার গ্রাম থেকে বিদায় নেয়ার পালা। এই ভোর বেলা পাওয়ার তেমন ইচ্ছে নেই। তবে ফুপি বেশ নাছড়বান্দা, কিছু তো মুখে নিতেই হলো। তিনি আমাদের সাথে একটি বক্সে করে আরো কিছু রুটি, শাক ভাজি আর ডিম দিয়ে দিয়েছেন।(কিশোরী কন্যা)

ভ্যান-ওয়ালা ব্যাগগুলো টেনে টেনে ভ্যানে উঠালো।আমি আর আম্মু সামনে আর তনু আর শৌভিক ভাইয়া পিছে বসেছেন। ফুঁপি আম্মুকে সাবধান করে দিয়ে বলছেন, ‘কাপড়-টাপড় গুছিয়ে সাবধানে সব, ভাবি। আর পৌঁছে ফোন দিয়ো।’

ফুপি একটু আস্তে করে বলে,

কত করে বললাম আর দু’দিন থাক…. তোমাদের আবার না।’

সময় হলো

ভ্যান চলছে। মাঝে মাঝে বেশ ঝাঁকি লাগছে। রাস্তার পাশে দু-চারটে গরু বাঁধা। শীত থেকে রক্ষা পেতে, গেরস্ত তাদের গায়ে চটের বস্তা বেঁধে দিয়েছে। বড় এক আম গাছে মৌ-মাছি চাক বেঁধেছে।

মৌ মাছিগুলো ভৌ ভৌ করে উড়ছে! সরষে ক্ষেতের দিকে। রাস্তার দু’পাশের বিস্তৃত মাঠ যেন সরষে ফুলে ফুলে হলুদ হয়ে আছে। দূর থেকে মনে হবে যেন মাঠে মাঠে সৌন্দর্য্যের আগুন জ্বলছে। হিম হিম বাতাস আর ফুলের গন্ধ!

ভ্যানটি বেশ দূরে চলে এসেছে। মনটা যেন গ্রামের দিকে টানছে।

এই তের-চৌদ্দ দিনের মধ্যে আমার শহুরে আরাম-আয়েশের একটু ব্যাঘাত ঘটেছে বটে, কিন্তু প্রকৃতি ছুঁয়ে দিয়েছে আমার মন! আমি যেন এই গ্রামের প্রেমে পড়েছি। হোক না কাঁদা মাটির গ্রাম, তাতে কী হয়েছে? আমার ত্বক হয়ত একটু কাল হয়েছে, তাতে কী আর আসে-যায়। (কিশোরী কন্যা)

প্রকৃতির ভালোবাসার শীতল পরশ আমাকে প্রতিনিয়ত সিক্ত করেছে। গাছ-পালা যেন হা করে, নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছে আমার দিকে। তারা বোদহয় বড় দুঃখ পেয়েছে। আমাকে ভালোবাসার পূর্বে তারা হয়তো বুঝতেই পারে নি যে আমার ঘর এ গ্রামে না। আমি শহরে যচ্ছি।

তবে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছি ব্যাগ ভর্তি স্মৃতি। হয়ত দেখতে পাব কোনো এক বিকেলে কিংবা অবসরে! সেই করিডোরে বসে! স্মৃতির পাতা উল্টিয়ে উল্টিয়ে হয়ত তখনও অনুভব করতে পারব এই কাঁদা মাটির গন্ধকে!

গ্রামের কাকিমা’র লেপ্টে দেওয়া গোবরের গন্ধ হয়ত এই শহরের কঠিন দেওয়ালের উপর দিয়ে উঁকি দিবে। আমি আকাশের বুকে তাকিয়ে খুঁজে নিব এই গ্রাম খানির পাঠানো চিঠি। পাগলের মত এরকম হাজার কথা ভাবছি! এ কথামালার নেই কোনো আগা-মাথা, নেই কোনো ভিত্তি!(কিশোরী কন্যা)

তবে এরি মধ্যে আমরা বাসেও উঠে পড়েছি। বাস চলছে, তার গতিতে। কিছু দূর ছিল শহুরে পরিবেশ তার পর আবার গ্রাম।

এই লোকারণ্যে আমি জন শূন্যতায় ভুগছি। পাশের সিটে আম্মু। কিছু জিজ্ঞেস

করলে বলেন, “এটা জিজ্ঞেস করার কী আছে?”(কিশোরী কন্যা)

তিনি আমার সাথে কথাবার্তায় বড়ই বেরসিক বাসে বসে বসে নীরবে, নিজের সাথেই কথা বলছি আর জানালা দিয়ে বাইরে ডাকাচ্ছি। পাশ দিয়ে সা. যা করে বাস গুলো চলে যাচ্ছে। আমার নীরবতা যে

নীরবতা নয় তা বুঝবে কে?

মনের ভিতর বয়ে চেলেছে অজস্র কথার স্রোত!

তনু শৌভিক ভাইয়ার সাথে ভালোই পাকামি করছে। কথা বলছে। হাসছে।

আমার বড় হিংসে হচ্ছে। আমার সিটটা শৌভিকের পাশে হলে ভালোই হত। অন্তত কথা বলে কাটিয়ে দেওয়া যেত। তবে হ্যাঁ, শৌভিকের পাশে বসলে কী বলতাম উনাকে? হঠাৎ মনে মনে একটু লজ্জিত হয়ে পড়লাম। এত কিছু ভাবতে ভারতে, বাসটি ফেরি ঘাটে পৌঁছে যায়। পথে ভিড় নেই। গাড়ি সংখ্যাও খুব বেশি নয়, তাই আমাদের গাড়ি দ্রুতই ফেরিতে উঠে পড়ল।

আম্মু গাড়ি থেকে নামতে চাচ্ছেন না। আমি, তনু আর শৌভিক ভাইয়া নেমে ফেরির দ্বিতীয় তলায় দাঁড়াই। তনু ঝাল চানাচুড় খেতে চায়।

শৌভিক ভাইয়া তিন প্যাকেট চানাচুড় নিয়ে আসেন। (কিশোরী কন্যা)আমি অবশ্য খেতে একটু আপত্তি করি। ভাইয়ার অনুরোধে খেতে হচ্ছে তবে জিহবা ঠিকই তার স্বাদ খুঁজে পেয়েছে। নদীর মাঝে মৃদু মৃদু বাতাস বইছে তবে রোদেরও কোনো কমতি নাই। অনেক

দূরের গ্রাম গুলো এখনো বেশ ঝাপসা মনে হচ্ছে। নদীর বুকে রয়েছে সুদীর্ঘ চর।

সেখানে যেন ফাঁকা থাকছে না, অনেক দূরে দূরে গড়ে উঠেছে মানুষের বসতি।

বড্ড সহজ সরল এই সব গ্রাম! দেখলে মনে হবে আধুনিক সভ্যতা থেকে পালিয়ে

এসেছে এই গ্রামগুলো।

আমার মনের ভাবনাগুলো খুবই বেশরম আর বেয়াড়া। কিচ্ছুই মানে না। শৌভিক ভাইয়ার হাত ধরে ঐ চরের গ্রামে পালিয়ে গেলেও মন্দ হয় না। না.. না.., ঠিক পালিয়ে যাওয়া নয়। হঠাৎ যদি ঝড় আসে আর আমাদের ফেরি খানা যদি দুমড়ে-মুচড়ে ঐ ডাঙায় গিয়ে পড়ে, আর সৌভিক ভাইয়া যদি আমায় রক্ষা করে ঐ গ্রামে নিয়ে যান। তাহলে কী

হবে?

Leave a Comment