কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -১৮

(কিশোরী কন্যা)-আমরাও ঠিক ঐ গ্রামের অধিবাসী হয়ে যাব। তাদের মত টিনের দো-তলা উঁচু ঘর তৈরি করব। নব সংসার হবে আমাদের দু’জনের। কিন্তু এখানে তো কৃষি কাজ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তিনি কী কৃষক হবেন?

ভালোবাসার খাতিরে না হয় কৃষকই হলেন। তাতে আর খুব বয়ে যাবে না। শিক্ষিত মানুষ কৃষক হলেও দাম আছে, গ্রামের দু’চার জন অন্তত তাকে মান্য করবে। আমাকেও হতে হবে কৃষকের গিন্নি। দিন ভর ব্যস্ত থাকতে হবে।

কিশোরী কন্যা - মাফিজুল ইসলাম পর্ব -১৮
কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -১৮

(কিশোরী কন্যা)

ঘরে ফসল তুলতে হবে, এগুলো রোদে শুকাতে হবে কিংবা নদী থেকে জল আনতে হবে। তবুও ভালো অন্তত মনের মানুষের সাথে একই চালার নিচে থাকা যাবে। দু’জনেই দিন ভর পরিশ্রম করব। ঘামের গন্ধে জড়িয়ে থাকবে ভালোবাসা। আমাদের বাড়ির আঙিনায় শীতকালে থাকবে মটরশুটি আর গ্রীষ্মকালে থাকবে সোনালী

ধান। তবে হ্যাঁ, গম আর আলু চাষ করলেও খারাপ হবে না। না…না…! আমরা কৃষক পতি-পত্নী হতে যাব কেন?

আমরা হব ঐ গ্রামের শিক্ষা দৃত। শিক্ষার আলো পৌঁছে দেব ঐ গ্রামের সকল কোমলমতি ছেলে-মেয়েদের অন্তরে। প্রয়োজনে ওখানে একটি বিদ্যালয় তৈরি(কিশোরী কন্যা)

করব। এবার হয়ত শৌভিক ভাইয়ার কোনো আপত্তি থাকবে না।

বাড়ির চারিদিক দিয়ে ফলফলাদির গাছে পরিপূর্ণ থাকবে। বাড়িতে আরো থাকবে হাঁস-মুরগি-কবুতর। গোয়ালে থাকবে গোটা কয়েক গরু। বলতে গেলে আমাদের বাড়ি হবে গ্রামের একটি আদর্শ বাড়ি। আমাদের থাকবে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে!

নিশ্চয় খুব বেশি দুষ্ট নয় তাদের চাওয়া-পাওয়া থাকবে ঠিক এই গ্রামের শিশুদের(কিশোরী কন্যা)

মতই। মাঝেমধ্যে আমার মা-বাবা নৌকায় করে বেড়াতে আসবে। আমাদের এই ছোটন-ছুটি গল্প শুনবে তাদের নানা-নানীর কাছে। জীবনটা যেন সোনালী আর ঝিলমিলে আলোয় পরিপূর্ণ। এ যেন বেদনার নীল আভা থেকে একটু দূরে বসবাস। আমার সকল চাওয়া যেন মুহূর্তেই পাওয়াতে পরিণত হয়ে গেল।

ফেরিটা হুইসাল দিচ্ছে! বেশ জোরে-সোরে এসে ধাক্কা লাগে টারমিনালের সাথে। এত সময় আমি যেন কল্পনার হাওয়ায় ভাসছিলাম। কোন বন দিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছিলাম তার কোনো হদিস নেই!

আমার চেতন ফিরে আসে। ও-মা কত্ত বড় স্বপ্ন, আমার ছেলে-মেয়ে পর্যন্ত হয়ে

গেছে।

এখনও চোখ যেন ঝিম ঝিম

মনে হচ্ছে শত বছর ঘুরে এসে এই মাত্র ফেরি ঘাটে পৌছালাম।

শৌভিক ভাইয়া আমার দিকে তাকিয়ে বলছেন, ‘সাহানা, চল বাসে উঠতে হবে। ফেরি থেকে এখুনি বাস নামতে আরম্ভ করবে।’ বাসগুলো একের পর এক নামতে আরম্ভ করল। ফেরির কাছের রাস্তাটি বড়

করুণ ব্যধিতে ভুগছে। এই রুগ্ন পথে চলতে চলতে আমাদের বাস ঝাকিতেঝাকিতে দুলছে। বাসটি কিছু সময় ধরে এটির যাত্রী সকলকে ঝাল-মুড়ির মত ঝাকল! এবার এটি হাইওয়েতে উঠেছে। হাইওয়েতে বাসটি পানির মত চলছে। মাঝে মাঝে হুইসাল দিচ্ছে। রাস্তার দুই পাশে গাছ-পালা আর ফসলের মাঠ আছে। (কিশোরী কন্যা)

কিন্তু চেহেরাটা ঠিক সেই গ্রামের মত নয়। একটু ভিন্ন রকম! আধুনিক সভ্যতা গ্রাম ধ্বংস করার পায়তারা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে বিস্তৃত জায়গা জুড়ে বালু ফেলানো আর সাইন বোর্ডে লিখা আছে, ‘প্লোট বুকিং চলছে…।’(কিশোরী কন্যা)

এই হাউজিং কোম্পানিগুলো বড় আজব। কোনো জায়গা ফাঁকা পেলেই ক্রয় করে তার পাশে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। বোধহয় খুব শীঘ্রই দেখতে পাব – মঙ্গল গ্রহে প্লোট বুকিং চলছে……!! দুপুর একটা বাজে।

আমাদের বাস নোংরা, পঁচা কালো পানির নদী পার হয়েছে। বুঝতে আর বাকি নেই যে আমরা গাবতলী পৌঁছেছি। বাস কাউন্টারের সামনে বাস থামে। যাত্রীরা তাদের মালামাল নিয়ে নামতে শুরু করে। হকার যাত্রীদের ব্যাগ নিয়ে টানাটানি করতে আরম্ভ করে। আমি, আম্মু আর তনু বাস থেকে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। শৌভিক ভাইয়া আমাদের জন্য একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে আনেন।

ঘণ্টা খানিকের মধ্যে বাসায় পৌঁছে যাই। বাসার সব কিছু যেন এলোমেলো মনে হচ্ছে। গ্রামের দিনগুলোর জন্য খুব মায়া লাগছে। কাঁধ থেকে ব্যাগটা রেখে ওয়াশ রুমে যাই, স্নান করে ছোট্ট একটা ঘুম দেই। বিকেলে নিত্য দিনের মতো চেয়ারে বসে আছি। আমার হাতে রয়েছে সেই কালো ক্যামেরা টা। গ্রাম থেকে তোলা ছবিগুলো বার বার দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। আবারও বন্দি হয়ে পড়েছি শহরের এই ইট পাথরের মাঝে!

কিশোরী কন্যা

ত্রিশ ডিসেম্বর।

রেজাল্ট করিস? তা বোঝা বড় মুশকিল!

যাহোক, পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর আম্মুর চিন্তা মুটামুটি দূর হয়।

সবাই আমাকে নিয়ে ভয়ে থাকলেও আমি আর তনু দু’জনই পরীক্ষায় অনেক(কিশোরী কন্যা)

১৪

দুপুর বারোটায় আমাদের জে.এস.সি. পরীক্ষার ফলাফল দিবে। ফলাফল হাতে না পাওয়া পর্যন্ত খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না। আম্মুও বেশ চিন্তায় আছে। আম্মু বলেন, ‘তোর তো আবার গতি-বিধির কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। কখন কী

ভালো ফলাফল করেছি। আম্মু অনেক খুশি হয়েছেন! এই তো দুই মিনিট আগে তিথি আর অনামিকার সাথে কথা হলো। ওরা অনেক ভালো ফলাফল করেছে। ওদের সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কত দিন ওদের সাথে দেখা হয় না! জানুয়ারির এক তারিখে স্কুলে যাব।

প্রত্যেক দিনই আমার কাছে অনেক বিলম্ব মনে হচ্ছে।(কিশোরী কন্যা)

কথায় আছে, মনের কথা মনে পঁচাতে নেই তাহলে এই দুর্গন্ধে নিজেকেই কষ্ট পেতে হয়। কয়েক ঝুড়ি কথা আমার মনের মধ্যে অপেক্ষা করছে! আমার কথগুলো তিথি আর অনামিকে বলার জন্য আমি বড্ড উতালা হয়ে উঠেছি। রাতে বাবা মিষ্টি নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। আমাদের পাশের কয়েক বাসায় মিষ্টি দিয়ে আসি।

এত দিন শুনেছি অষ্টম শ্রেণির পড়া-লেখা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু আজ বাবা আর আম্মুর ভাষ্য একটু পরিবর্তন হয়েছে। এখন বলছেন নবম-দশম শ্রেণিতে খুব ভালো করে পড়াশোনা করতে হবে তা না হলে ভবিষ্যৎ পুরো অন্ধকার। অবশ্য কথা শুনে আমি নিজেই অন্ধকারে পড়ে গেলাম। জে.এস.সি. পরীক্ষা শেষে বেশ খুশি হয়েছিলাম যে ক্লাস নাইনে উঠে আমাকে বুঝি আর খুব বেশি পড়তে হবে না। কী আর বলব! আমার আব্বু আম্মু দু’জনই পাকা রাজনীতিবিদ। তাঁরা কোথাকার কথা কোথায় নিয়ে যায় তা বোঝা বড় মুশকিল।(কিশোরী কন্যা)

পহেলা জানুয়ারি!

নবম শ্রেণির প্রথম ক্লাস। আমি মনে মনে বেশ আনন্দিত।

নিজেকে এখন একটু বড় বড় মনে হচ্ছে। তাছাড়া এখন পিটির সময় আমাদের শ্রেণির সারি দাঁড়াবে ঠিক দশম শ্রেণির পাশে। আবার কিছু দিন পরেই বড় আপুর তকমা পাওয়ার অপেক্ষায় আছি। তখন বেশ ভালোই লাগবে! অপুদের মতোই ছোটদের উপদেশ দিব। সমাধান দিব ছোট-খাটো সমস্যার। আমার ভাবতেই ভালো লাগছে যে, বড় ক্লাসে পড়লে ছোট

ক্লাসগুলোর শিক্ষার্থীরা উপদেশ গ্রহণ করে। কী বলব আর জীবন ভর শুধু উপদেশ

নিয়ে গেলাম, দিতে আর পারলাম না।(কিশোরী কন্যা)

পিটির লাইনটা সরতে সরতে প্রথম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণির পাশে এসে পৌঁছেছে। এই তো এ বছর গেলে আমরাও দশম শ্রেণির লাইনটা দখল করে ফেলব এবং তার পরে আমাদেরকে অন্যরা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিবে স্কুলের বাইরে। এই তো আমাদের জীবন! পরিবর্তনই জীবন!

এ কথা ভাবতেই আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে যে অতী সত্তর – এই বিদ্যালয়, এই মাঠ, এই শ্রেণি কক্ষ, এই কমন রুম সবকিছুই ত্যাগ করে চলে যেতে হবে। এ-সবকিছু আমার কাছে বড় আপন মনে হয়। কোনো এক দিন এরা হয়তো আমার বড় পর হয়ে যাবে। আমি হয়তো এদের চিনতে পারলেও ওরা আমাকে আর চিনবে না।

আমি হয়তো আবারও কাউকে আপন করে পাবো দূরের কাউকে যাকে আমি এখন পর্যন্ত কল্পনাই করতে পারছি না, কিংবা দূরের কোনো জিনিসকে যা আমি দেখিনি কখনো। পৃথিবী ঘুরছে! মানুষও ঘুরছে সময়ের লেজ ধরে! মানুষ সময়ের সাথে সাথে চলে যায় অনেক দূরে, ঠিক যেন ঐ তারার দেশে!(কিশোরী কন্যা)

আমাদের স্কুলে যে সকল শিক্ষার্থী জে.এস.সি তে খুব ভালো ফলাফল করেছে তাদেরকে বিজ্ঞান বিভাগ দেওয়া হয়েছে। ক্লাস গুলো এখনও বিশৃঙ্খল, যার যে বিভাগে ক্লাস করতে ইচ্ছে হচ্ছে সে সেই বিভাগেই ক্লাস করছে। আজ এ বছরের তৃতীয় দিন!

সম্পূর্ণভাবে ক্লাস শুরু হতে আরো বেশ কিছু দিন সময় লাগবে।

Leave a Comment