কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -১৯

(কিশোরী কন্যা)-তবে আমার কাছে বড্ড ভালোই লাগছে কারণ স্কুলে শুধু আসা-যাওয়া হচ্ছে কিন্তু কোনো লেখা-পড়া করতে হচ্ছে না। আবার অনামিকা আর তিথির সাথে জমিয়ে

গল্প করতে পারছি।

আমার কাছে পুরো বছরটা জানুয়ারি মাস থাকলে ভালো-ই হতো!

শুধু বন্ধ আর বন্ধ!

আমরাও আড্ডা দিব! শুধু আড্ডা! আড্ডার সাথে থাকবে মন্টু মামার ঝাঝালো ঝালের চটপটি আর ফুচকা!

সবেমাত্র চারটি বই পেয়েছি বাংলা, ইংরেজি, পদার্থ আর জীববিজ্ঞান। ক্লাস যেন নয় আড্ডা খানা। এরকম চললে তো স্কুলের প্রতি দরদ জমে যাবে। যার যার মত। কথায় ব্যস্ত। আজ অনামিকা আসেনি তাই আমাদের কথা-বার্তায় খুব বেশি সুবিধা হচ্ছে না। তথাপি, আমি আর তিথি কথা বলছি।

কিশোরী কন্যা - মাফিজুল ইসলাম পর্ব -১৯
কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -১৯

(কিশোরী কন্যা)

জানুয়ারি মাসের ক্লাস বলে কথা, শিক্ষক মহাশয়ও একটু সুতো ছেড়ে বসে

আছেন। ক্লাসের মধ্যে যেন পাখির কিচিরমিচির। এক সময় সকলে নিস্তব্ধ হয়ে

যায়, অবশ্য আমরাও।

স্কুলের দপ্তরি, দবির চাচা, নোটিস নিয়ে এসেছেন। শিক্ষক আমাদেরকে নোটিস পড়ে শুনান। এ মাসের দশ তারিখ পর্যন্ত দু পিরিয়োড করে হবে তারপর আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে ক্লাস শুরু হবে।

আমরা শুনে ইয়ে… ইয়ে বলে চিৎকার করি। আমাদের ছেলেমি দেখে, শিক্ষক আমাদের প্রতি একটু রুষ্ট হয়ে যান। আমাদেরকে একটু কড়া মেজাজে বলেন,(কিশোরী কন্যা)

‘তোমরা এখন আর ছোট নয়, ক্লাস নাইনে উঠেছ! নাইনে! বেশি তিরিং বিরিং করলে একদম ঝরে পড়বে। কপালে পাশ জুটবে নারে!’ স্কুলের সুদীর্ঘ বেল বাচ্ছে।

এটি ছুটির বেল!

শিক্ষার্থীরা হইহুল্লুর করে বেরোচ্ছে।

অনেক ভীড়!

একদম পা ফেলা যাচ্ছে না। চায়ের দোকানের সামনে বাইক রেখে আড্ডা দিচ্ছে কিছু ভখাটে ছেলে। কিছু ছেলেরা আবার ভীড় ঠেলে চলতে পছন্দ করে। আর বেশি না-হয় না-ই বললাম।

তাই আমি আর তিথি একটু পরেই স্কুল থেকে বের হব। তাছাড়া এখন তো রিক্সাও পাওয়া যাবে না। তিথি আকিবকে নিয়ে বেশ গল্প বলছে। আর আমি হচ্ছি ওর গল্পের শ্রোতা। আমার অবশ্য ওদেরকে বলার মতো এত ভালো রোমান্টিক গল্প নেই যা দিয়ে আসরটা জমিয়ে রখব। বলতে পারেন প্রেমে-পিরিতে ওদের থেকে কম করে দু’শ মাইল পিছিয়ে আছি।(কিশোরী কন্যা)

ওদের সকলের ভাবভঙ্গি দেখে মাঝে মধ্যে নিজেকে বেশ ছোট আর আনস্মার্ট মনে হয়। মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করি যে আমি হয়তো ওদের থেকে একটু কম সুন্দরী তাই হয়তো স্কুল ছুটির পর আমার জন্য কেউ অপেক্ষা করছে না। কিন্তু তাই যদি হবে তবে নাতাশার তো কোনো বয়ফ্রেন্ড থাকার কথা নয়।(কিশোরী কন্যা)

কোনো দিনই আমার থেকে বেশি সুদর্শনা নয়। তবে শুনেছি ও নাকি দু-চারটে বয়ফ্রেন্ড নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরায়। বাব্বা… ওরা পারেও বটে। সবচেয়ে বড় কথা আম্মু আমাকে খুব বেঁছে খুটে রাখেন তাই তো। আমরা দু’জন রাস্তার বাম পাশ দিয়ে হাঁটছি। তিথি টেপ রেকোর্ডারের মতো বলে চলছে। তার কথা থামাথামির কোনো নাম-গন্ধ নেই, সে হাঁটছে আর বলে চলছে। আমিও হাঁটছি কিন্তু আমার মনটা বুঝি আমার কাছে নেই। আমাকে যতই লাগাম ধরে রাখা হউক না কেন আমার ভিতরকার মানুষটি যেন উড়ছে।

দূরে বেশ দূরে।

যেখানে রয়েছে আমার ভালো লাগা!

যেখানে আমার আশা। যেখানে আমার স্মৃতি!

হয়তো যেখানে আমার বিস্ময়!

হঠাৎ মনেহচ্ছে আমাদের পিছু পিছু কেউ হাঁটছে। আমাদেরকে লক্ষ্য করছে। মনে আসছে অনেক সংশয় আর ভাবনা। আমাদেরকে কেন লক্ষ্য করছে। আমাদেরকে কী কিছু বলবে?(কিশোরী কন্যা)

কিছু দূর গেলে আমার চিন্তা দূর হয়। লোকটি ডানদিকের পথে চলে যায়। আমরা যাই বাম দিকে। মনে মনে একটু লজ্জিত হই। কী ই-না ভাবলাম। পথ দিয়ে কত পথিকই যায়। সবাই তো একই উদ্দেশ্যে হাঁটছে না। কেউ মানুষ খুঁজছে! আবার কেউ পথ খুঁজছে।

আমাদের অনুসরণ করার কোনো প্রশ্ন আসছে না। আর অনুসরণ করবে ই-বা

কেন? পথ তো সকল পথিকের। কাউকে অনুসরণ করে নয়, পথিক চলে তার(কিশোরী কন্যা)

আপন গতিতে!

এরকম কত জল্পনা-কল্পনা করতে করতে কখন বাসায় ফিরি তার কোনো ইয়াত্তা নেই। আমার মনের কথাগুলো ডায়েরিতে লিখলে হয়ত অদ্ভুতই মনে হবে। বাসায় ফিরে আসলে শরীরের ক্লান্তি ঠিকই দূর হয় কিন্তু বান্ধবী ছাড়া বুকের ভিতরটা যেন শুকিয়ে যায়। ওরা আমার কাছে নিশ্বাসের মতো। যত সময় পর্যন্ত ওদের সাথে দেখা না হয় তত সময় আমার জমে থাকা কথাগুলো কুটকুট করে কামড়াতে থাকে। তবে জানালার পাশের খোলা আকাশটা, আমাকে কিছুটা হলেও শাস্তি দেয়।

যাচ্ছি প্রায় সপ্তাহ হয়ে যাচ্ছে। এখন নিয়মিত ক্লাস করতে হচ্ছে। আস্তে আস্তে পড়াশুনার চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্লাস নাইনে উঠে পড়াটা মুখস্ত থেকে বোঝার প্রয়োজনীয়তা বেশি উপলব্ধি করছি। তাই আজকাল আমার কাছে শৌভিক ভাইয়ার গুরুত্বটা বেশি বেড়ে চলেছে। সাইগন এর বিষয়গুলো তো আর সবাই সুন্দর করে বোঝাতে পারেন না, তবে এক্ষেত্রে শৌভিক ভাইয়াকে একশতে একশই দিতে হবে। আমার মত গাধা শিক্ষার্থী নাকি এ-প্লাস পেয়েছে। আজ সোমবার।(কিশোরী কন্যা)

শৌতিক ভাইয়ার ল্যাব-ক্লাস নেই। তাই তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরেছেন। আজ আমাকে পড়াচ্ছেন। ‘সাহানা সাইন্স নিয়ে পড়তে কেমন লাগছে? সব বিষয়গুলো বুঝতে পারছো তো।’

‘হু… ভালো। খুব ভালো লাগছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের নতুন নতুন বিষয় জানতে পারছি। জানতে পারছি পৃথিবী সম্পর্কে। জানতে পারছি নিজ সম্পর্কে। বিজ্ঞান বিভাগে না পড়লে হয়ত নিজ সম্পর্কে অনেক কিছুই অজানা থেকে যেত।… আপনার মত শিক্ষক থাকতে তো আর কোনো সমস্যাই নেই। সব বুঝেছি… খুব ভালো করে বুঝেছি তবে…..!’ ‘তবে, কী?’(কিশোরী কন্যা)

‘ফিজিক্সের আর হায়ার ম্যাথের অংকগুলো বেশ কঠিন মনে হচ্ছে।’ ‘ভুল.. সম্পূর্ণ ভুল বলেছ! পৃথিবীর কোনো বিষয়ই কঠিন নয়। আর এসব তো মানুষেরই সৃষ্টি। মানুষ হয়ে মানুষ যদি খোদার কালাম বুঝতে পারে তবে এই সামান্য মানুষের তৈরি এই তত্ত্ব-সূত্র বুঝবে না কেন? তোমাকে লেখা-পড়ায় আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে, বুঝলে। ও.. আর একটি কথা! কী যেন বলেল- বিজ্ঞান না পড়লে নিজ সম্পর্কে জানতে পারতে না।

কথাটি সম্পূর্ণ ভুল! বস্তুত প্রত্যেকটি মানুষই বিজ্ঞানী। সে প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো কিছু গবেষণা করছে। সর্বদাই কোনো না কোনো ভাবে নিজেকে জানার চেষ্টা করছে। যাকগে….. রাখো ওসব কথা… বই বের কর বেশ দেরি হয়েছে।’ ‘আচ্ছা, বলুন তো আপনার সমস্যা কোথায়? আপনি কী আমার সাথে এই বইয়ের বাহিরে একটা কথাও বলতে পারেন না। কেন আপনার নিউটন সাহেব কী আপনাকে আমার সাথে বইয়ের বাহিরে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। … না.. ক…’ না… ওরকম কিছু না। আমি এটাই বুঝি আর এটাই সত্য যে পড়ার

টেবিলে তুমি আমার ছাত্রী আর টেবিলের বাহিরে… আর পড়ার টেবিলের বাহিরে আপনি আমাদের অতিথি, তাই তো!” ‘তুমি যদি আমাকে অতিথি ভাবো তবে তাই, আর যদি আত্মীয় ভাবো(কিশোরী কন্যা)

তাতেও আমার কোনো আপত্তি নেই; সেটা তোমার একান্ত ব্যাপার।

‘আচ্ছা, আপনি কী নিউটনের তৃতীয় সূত্রটি বিশ্বাস করেন?” ‘ও… প্রত্যেক ক্রিয়ার সম পরিমাণ প্রতিক্রিয়া রয়েছে, তাই তো! এটি বিশ্বাস না করার ই-বা কী আছে। তিনি এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরা এটি

যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। এই যেমন ধর তোমাকে যদি

চিমটি কাটা হয় তাহলে তুমি নিশ্চয়ই চিৎকার দিবে। এটি তো এর

ধরণের প্রতিক্রিয়া। তাই না।’

‘কচু বুঝেছেন!’

‘দেখ সাহানা! সাইন্স পড়ছ ভালো কথা, তোমার মনে কৌতূহল রয়েছে তাও খারাপ নয়। আর সব কৌতুহলী বিষয়ই যে আমার কাছ থেকে জানতে হবে তা ঠিক নয়। জানার জন্য, শেখার জন্য নির্দিষ্ট

Leave a Comment