কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৩

(কিশোরী কন্যা)

জুরে কি করছে ছেলেটা, কে জানে?

তাছাড়া, তিনি আমাদের পড়া-শুনায় কম সময় দেওয়াতে আম্মু হয়তো তাঁর প্রতি এত বেশি খেয়াল রাখবেন না। ছেলেটি পরিবার পরিজন ছেড়ে আমাদের সাথে থাকে। না-জানি কত রকম সুবিধা-অসুবিধা নিজের মনের মধ্যে লুকিয়ে রাখেতে হয় তাঁকে।

তবুও ভালো এ দেড় বছরে আমাকে একটুকু আধাটুকু মনের কথা বলে। বস্তুত মনের কথা মানুষ মানুষকে খুব কমই বলে!

কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৩
কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৩

কিশোরী কন্যা

যদি এ কথাগুলো মানুষকে খুব বেশি আঘাত করে কিংবা তার মনের পক্ষে এর ভার বহন করা সম্ভাব না হয়, কেবল তখনই সে তা অন্যকে বলে।

আজ অনামিকা আর তিথি আমি বেশ রেগে আছি।

ওরা বলে, ‘কী জানি ভাই! তুই যেন কেমন নিরামিষ হয়ে যাচ্ছিস। কী….. রে

প্রেমে-টেমে পড়লি নাকি?’

কথা শুনে আমি একটু চমকে উঠি। ওদের সাথে এসে বারান্দায় দাঁড়াই। ওরা অনেক কথা বলে চলছে, আমি ওদের কথার তাল রক্ষার্থে মাঝে মাঝে একটু একটু বলছি। তিথি টা–না খুব পারেও বটে! সে স্কুলের সকল স্যার-ম্যাডামের নকল করতে পারে। ওর সাথে দু’মিনিট থাকলে না হেসে পারা যায় না।

বিকাল পাঁচটা বাজে!

আমাদের স্কুল ছুটি হয়েছে। তিথি আর অনামিকার বাসা একদিকে হওয়ায় ওরা

এক সাথে রিক্সায় যায়। আমি আর একটি রিক্সায় করে বাসায় ফিরছি। বাসায় ফিরতে ফিরতে মাগরিবের আযান দেয়। বাসায় ফিরে দেখি আম্মু শৌভক ভাইয়ার আম্মুর শৌভিক ভাইয়ার প্রতি সমীহ দেখে, আমি রিতি মতো চমকে যাই।(কিশোরী কন্যা) অবশ্য

মাথায় পানি দিচ্ছেন।

মনে মনে বেশ লজ্জিতও হয়েছি। নিজের মায়ের সম্পর্কে এত সময় কী ভেবেছি!

শত হলেও তো তিনি একজন মা!(কিশোরী কন্যা)

এক জন নারীর বাহ্যিক আচরণ যাইহোক না কেন? যখন তিনি মা হন, তখন ঠিকই তিনি মায়ের মতো আচরণ করেন। তাঁর হৃদয়ে থাকে স্নেহ আর ভালোবাসা! আম্মু তনুকে ডেকে বলে, ‘তনু… তনু…! তোর ভাইয়াকে এই দুধ আর ডিমটি

দিয়ে আয় তো।”

আজ রাতে একাই পড়ছি।

তনুর গণিত বুঝতে একটু সমস্যা হচ্ছে। আমি ওকে একটু গণিত বুঝিয়ে দেই। নিজে কেমন বুঝি সেটি বড় বিষয় নয় মাস্টারি করতে হলে একটু ভালো করেই করতে হয়। অবশ্য তার মতো বেয়াড়া ছেলের মাস্টারি করাটা একটু কঠিন কাজ। তারপর আবার নিজের পড়ায় মনোযোগী হই। আজও প্রায় মধ্য-রাত পর্যন্ত পড়ি। খাওয়া-দাওয়া করে ঘুমুতে যাই। আজ পাবন নয় কেবল শৌভিক যেন আমার ভাবনার কেন্দ্র বিন্দু। চোখ বুজেও দূরে সরাতে পারছি না।

আমার মনে হচ্ছে- ও যদি আমাকে নিয়ে উড়ে যেত কোনো এক স্বপ্নের দেশে। যেখানে থাকবে নীরবতা, থাকবে ভালোবাসা। আমাদের ছোট ঘর হবে। থাকবে সুরভীত ফুলের বাগান। গ্রীষ্মের রাতে দুজনে বসে থাকব, ফাঁকা আলিন্দে। মাঝে মাঝে ফুরফুরে বাতাস বইবে। (কিশোরী কন্যা)

দু’জনের গল্পে জ্যোৎস্না ফুটে উঠবে। বসে বসে শৌভিকের কবিতা শুনব। আমি তার দিকে বাড়িয়ে দিব একটি চায়ের পেয়ালা। ক্লান্তি দূর করে জেগে থাকর অনেক রাত্তির পর্যন্ত। আমার মেহেদি পরা হাতটি শৌভিক তার কোলের মধ্যে নিবে। এভাবে কত শত ভাবনায় আমি ঘুমিয়ে পড়ি, এক নীরব ঘুমের রাজ্যে। চারিদিকে

অন্ধকার! খুব অন্ধকার!

আরো সপ্তাহ খানেক পরের কথা।

শৌভিক ভাইয়া সুস্থ হয়েছেন। আমাকে পড়ানো শুরু করেছে। আজকাল পড়া ভিন্ন আমার মনে নানা প্রশ্ন আসে। কী বলব! কোনো কথাই মুখে আসে না। শুধু পড়া আর পড়া। মাঝে মাঝে আমি নীরব হয়ে যাই।

এভাবেই আমার দিন কাটছে। মাঝে মাঝে উৎফুল্লে আবার মাঝে মাঝে উদ্বিগ্নে

আমার সময় অতিবাহিত করছি। আগামী সপ্তাহ থেকে শৌভিক ভাইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে উঠবেন। আমি দিন গুনতে থাকি। অবশেষ আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, ‘আচ্ছা ভাইয়া। আপনার কী হলে না উঠলে হয় না? এখানে আমরা কী আপনাকে খুব বিরক্ত করি?’

‘না-রে বোকা! আমি কী তাই বলেছি! আর তনু সে আমার ছোট ভাইয়ের মতো। আসলে, হলে থাকলে আমার জন্য অনেক সুবিধা হবে। সেখানে আমি আমার ক্লাসমেটদের সাথে স্টাডি করতে পারব। লাইব্রেরিতে অনেক সময় পড়তে পারব। এরকম ডজন ডজন সুবিধা রয়েছে। … যাক্‌গে, মন খারাপের কিছু নেই আমি সময় পেলে তোমাদের বাসাতেই তো আসব। তোমরা ছাড়া এখানে কী আমার কেউ আছে। জানি প্রথম প্রথম আমারও বেশ খারাপ লাগবে কিন্তু এছাড়া যে কোনো উপায় নেই!…… বেশ রাত হয়েছে উঠি তাহলে, ঘুমিয়ে পড়। ও আর একটা কথা পড়ার জন্য তোমাকে আমি সময় সময় বেশ বকা-ঝকা করেছি তাতে একদম মনে কিছু করবে না।’(কিশোরী কন্যা)

তিনি এটুকু বলে তার কক্ষে চলে গেলেন। আমি যে স্টাডি টেবিলে থ’ হয়ে কিছু সময় বসে থাকলাম। শৌভিক ভাইয়ার কথা শুনে বেশ খারাপ লাগছে। মনের মধ্যে বেদনার শুষ্ক বর্ষার সৃষ্টি হচ্ছে।

শনিবার সকাল!

শৌভিক ভাইয়া একটি সি.এন.জি ভাড়া করে এনেছেন। সাথে নিচ্ছেন একটি তোসক আর ভাইয়ার কিছু বই-খাতা। ঘরটা খালি খালি মনে হচ্ছে। তনু অনেক করে বলছে,(কিশোরী কন্যা)

‘ভাইয়া, তুমি থাকলে কী হয়? এখান থেকে ই-তো ইউনিভারসিটিতে যেতে পারতে।’

‘দেখ, তনু জিদ করো না, লক্ষি ভাইয়া! কষ্ট পাওয়ারও কিছু নেই। তাছাড়া, আমি তো আর শহর ছেড়ে যাচ্ছি না। ছুটি-টুটি পেলেই তো সোজা চলে আসব। …….. লক্ষি ভাই! একদম দুষ্টুমি করবে না। আম্মুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে।

আমার দিকে ফিরে বলে, ‘সাহানা, ভালোভাবে পড়বে। আর আমি তো মাঝে মাঝে(কিশোরী কন্যা)

আসছি। কোনো বিষয় সমস্যা থাকলে বুঝে নিবে।

বেশ কয়েক মাস হয়ে গেল। শৌভিক ভাইয়া মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় আসেন। আমাদের পড়াশুনা তদারকি করেন। আমার কোনো গাণিতিক সমস্যা থাকলে বুঝে নেই। আবার মাঝে মাঝে কোনো কিছু না বুঝলে, আম্মুকে দিয়ে ফোন করিয়ে আসতে বলি। তবে আমি কখনো ফোনে কথা বলি না। আমার ইচ্ছা হলেও বলি না। এমন কি শৌভিক ভাইয়া ফোন করলে, আমি আমার আম্মুর কাছে

নিয়ে যাই।(কিশোরী কন্যা)

বলি ‘আম্মু! ভাইয়া ফোন করেছেন।’

এভাবে এক মাস দু’মাস করতে করতে এ বছরটাও চলে যায়। আমি দশম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছি।

এখন আমি বিদ্যালয়ে একজন দায়িত্ববান শিক্ষার্থী। আমার ছোট ভাই তনুর লেখা-পড়াও আমি দেখাশুনা করি। তবুও, আম্মু এখনও আমার পড়া-শুনা নিয়ে মাথা ঘামান। আম্মু’র শাসন বারণ সেই আগের মতোই আছে। আমি বেড়ে চলছি প্রাকৃতির নিয়মে। পরিবর্তন হচ্ছে পরিবার। বৃদ্ধি পাচ্ছে সম্পর্কের জাল। আমি একটু আবেগী হলেও আমার মাঝে রয়েছে কিছুটা বুদ্ধিবৃত্তের ছাপ।(কিশোরী কন্যা)

এদিকে শৌভিক ভাইয়ারও বন্ধু-বান্ধবের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ছাত্রাবাসের জীবন উপভোগ করছে। ভোগ করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন মুক্ত বাতাস। নম্র-ভদ্র এই ছেলেটি, মাঝে মাঝে হয়ে পড়ছে প্রতিবাদী আবার কখনো বা সমাজসেবী। একজন মানুষের মাঝে যে এত কিছু থাকতে পারে আমি তা ভুলেও ভাবিনি।

এই তো সেদিন টিভি দেখা মিলল – শৌভিক ভাইয়ার! নারীর উপর অত্যাচার করায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টি.এস.সি চত্ত্বরে দাড়িয়ে আছেন বিশাল এক ব্যানার নিয়ে।(কিশোরী কন্যা)

সেখানে লেখা আছে, “সভ্য সমাজ রুখে দাড়ান, নারী নির্যাতন বন্ধ করুন।” আবার মাঝে মাঝে পত্র-পত্রিকায় প্রযুক্তি বিষয়ে লেখা-লেখিও করছেন। আড্ডা দিচ্ছেন, গল্প করছেন! আবার কখনো গান গাচ্ছেন! আমি শুধু অতীতকে ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছি! এই ছেলের মাঝে যে এত চাঞ্চল্যতা আছে আমি আগে ভাবতেও পারি নি। আমার মনে হয় বিপরীত আছে বলেই আমারদের এই পৃথিবী এত সুন্দর। যেমন দেখুন, আধার আছে বলেই আলোর প্রয়োজন। খারাপ আছে বলেই ভালোর প্রয়োজন। দুঃখ রয়েছে বলেই আনন্দের প্রয়োজন। আমি মনে করি প্রত্যেক বিপরীতই আমাদের শিখাচ্ছে। তা না হলে স্বরব মানুষ কখনো নীরব হতো না আবার নীরব মানুষ কখনো স্বরব হতো না। মূল বিষয় হচ্ছে সময় আর পরিস্থিতি মানুষকে বদলে দেয়। যাকে আমরা ভাল বা ভাগ্য যাই বলে থাকি না কেন! বৃহস্পতি বার!

Leave a Comment