কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৪

(কিশোরী কন্যা)তিনি আম্মুকে ফোনে বলেছেন যে আজ আমাদের বাসায় আসছেন। আমি মনের অজান্তে আমার চুলগুলো একটু গুছিয়ে নেই। পড়ার টেবিলে বসে বইগুলো উল্টিয়ে উল্টিয়ে সমস্যাগুলো খুঁজে বের করার চেষ্ট করছি কিন্তু কোন সমস্যা দেখাবো বুঝতে পারছি না।(কিশোরী কন্যা) তবে বড় সমস্যা কোথায় বুঝে উঠতে পারছি না এই সমস্ত বইতে নাকি আমার মনে? নাকি মাথায়? আমার এ সমস্যা বুঝি এ জীবনে দূর হবার নয়।

তিনি আমাদের বাসা ত্যাগ করাতে সমস্যার পরিমাণ আরো বেড়েছে। আমি কখন কিভাবে তাকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা শুরু করি তা নিজেও বুঝতে পারছি না। আমার কথা শুনে হয়তো কারো খারাপ মনে হতে পারে, বস্তুত কোনো মেয়ের মনই ফাঁকা নেই। কেউ না কেউ তার মনের মধ্যে বসবাস করে। সন্ধ্যায় কলিং বেল বাজছে। তনু দৌঁড়ে গিয়ে গেট খুলে। শৌভিক ভাইয়া এসেছেন। আম্মু রান্না ঘরে রান্না করছেন। ভাইয়া আসার কথা শুনে তিনি ভাইয়ার জন্য চা নিয়ে আসেন।

কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৪
কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৪

কিশোরী কন্যা

‘বাবা! একটু বিশ্রাম নিয়ে তোমার ভাই-বোনের পড়াশুনাটা একটু দেখ।

তুমি যাওয়ার পরে ওদের লেখা-পড়া তো গোল্লায় গেছে। দেখ কী কাণ্ড! কিছু দিন পর মেয়ের এস.এস.সি পরীক্ষা সে কী-না এভাবে সময় নষ্ট করে। এখন তো সে বড় হয়েছে। আমার কথা একদমই কানে যায় না।’ ‘উফ.. হু! আম্মু যাও তো এখন। আমার পড়া তুমি পড়ে দাও।’ ভাইয়ার কাছ থেকে আমার কিছু ম্যাথমেটিক্যাল সমস্যা সমাধান করে নেই। অংক বুঝার ফাঁকে বলি,(কিশোরী কন্যা)

‘একটা কথা বললে আপনি তো কিছু মনে করবেন না?…. না থাক!’ ‘না… না…! বলো, সমস্যা নেই।’

‘মানে… মানে..! আমার বান্ধবীরা আপনাকে দেখতে চায় তাই, আপনি যদি শনি বারে……

‘তোমাদের স্কুলের সামনে যাই, তাই তো!’

‘না… কিছু না। এমনিতে বললাম।”(কিশোরী কন্যা)

আমাদের দু’জনকে পড়াতে পড়াতে বেশ রাত হয়ে যায় তাই ভাইয়া আজ আর হলে ফিরছে না। রাতের খাবার শেষে তিনি বাবার সাথে কথা বলছেন আর টিভি দেখছেন।

আজ রাতে আমার মাথা দিয়ে বড়ই আজব আজব চিন্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি

যদি পালিয়ে বিয়ে করি তাহলে ব্যাপারটা খুব জমবে। এক দিকে আমার আব্বু

আম্মু আমাকে খোঁজ-খুজি করবে অন্যদিকে আমিও তাদের চোখে পড়ার ভয়

পাব। সব মিলে মুটামুটি একটি ড্রামা সৃষ্টি হবে! কিন্তু পালাবো কাকে নিয়ে?

প্রেম করার মতো তেমন কোনো ছেলেই খুঁজে পেলাম না। আসপাশে যাদের দেখি সবাই ভণ্ড! তিলকে তাল বানিয়ে মেয়ে পটানোর ধান্দায় থাকে। কিছু কিছু ছেলে আছে যারা নিজেদের স্মার্টনেস ভাঙ্গিয়ে মেয়েদের মন যোগানো চেষ্টা করে। (কিশোরী কন্যা)কেউ

বা আছে রসের কথা আর গিফটের পানিতে ভিজিয়ে মারতে চায়। আমার বাবা ঠিকই বলেন, ‘কারো অতিরিক্ত প্রশংসায় কান দিবে না কারণ মানুষ কোনো কারণ ব্যতিত কারো প্রশংসা করে না।

আবার মনের হুট-হাট সিদ্ধান্তও গুরুত্ব দেওয়া ঠিক নয় কারণ আমাদের মন প্রতি ষাট সেকেন্ডে একশ বার করে পরিবর্তন হয়। কোনো বিষয়কে খুব জটিল ভাবে না নিয়ে সহজভাবে গ্রহণ করতে হবে আর নিজের বুদ্ধি বিবেক দিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করতে হবে। কাউকে খুব বন্ধু ভাবাও ঠিক নয় আবার খুব শত্রু হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন নেই, আসলে মানুষকে স্বাভাবিক ভাবে দেখাই শ্রেয়।’

অবশ্য বাবার কথা এত বেশি বিচার বিশ্লেষণ করলে তো প্রেমিক হিসেবে পাশের(কিশোরী কন্যা)

বাড়ির আক্কাস আলীও জুটবে না। বাবার কথা না হয় বাদই দিলাম। শৌভিক ভাইয়া ই-বা কেমন মানুষ! কারো চোখ দেখে কী বোঝা যায় না যে সে কী বলতে চায়। না-কি তিনি বুঝেও না বুঝার ভান করেন। তিনি শুধু বোঝেন জীবনে একটাই কাজ আছে সেটি হচ্ছে পড়াশুনা আর পড়াশুনা। আমার মনে হয় উনাকে ওপেন হার্ট সার্জারি করলে উনার

ভিতরে কয়ে খণ্ড পাথর পাওয়া যাবে!(কিশোরী কন্যা)

আজব! বড় আজব! বলুত তো কোন মানুষটা প্রেম ছাড়া রয়েছে? আমার মনে এরকম শত শত ভাবনা এসে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। চোখের পাতা বুজে গেলে কোন রাজ্যে চলে যাই তা আমি নিজেই জানি না। তবে এটুকু বলতে পারব যে, এই যাতনাময় পৃথিবী থেকে এক সুন্দর-নির্মল পৃথিবীতে চলে

যাই। ঠিকানাহীন পথে নিজ ঠিকানা খুঁজে পাই। কানের কাছে যেন ফিস ফিস আওয়াজ হচ্ছে। ওপাশে ফিরে দেখি ‘শৌতিক’। আমি মুখ দিয়ে কোনো কথা বলতে পারছি না। আমার মুখটা তিনি হাত দিয়ে আটকে রেখেছেন। তারপর তিনি তাঁর মুখ আমার কানের কাছে এনে বলছেন,

সাহানা, চলো পালাই!”

‘মানে কী? কোথায় পালাবো??

যে দিকে চোখ যায় সেদিকে!”

‘দরজারটার ছিটকেনি টা বড় টিংটিঙে খুললে বাবা নিশ্চিত টের পাবেন।

আমার খুব ভয় হচ্ছে।

‘ঐ-দেখ আমি তোমার জন্য তোমার ছাদ ফুঁটো করেছি!” আমি আর কথা না বাড়িয়ে শৌভিক ভাইয়ার হাত ধরে বেরিয়ে পড়লাম। কথায় আছে বাতাসেরও কান আছে। এ ঘটনা রটে গেল। আমার আব্বু-আম্মুর টকন নড়েছে।

আব্বু আমাদের পিছনে পুলিশ লাগিয়ে দিয়েছেন। আমরা দু’জনে খুব দৌঁড়াচ্ছি!

দৌড়াতে দৌড়াতে আমরা এক নির্জন স্থানে আশ্রয় নেই। আমি ঘেমে একদম(কিশোরী কন্যা)

চুপচুপে হয়ে গেছি। বুকের মধ্যে পরাণটা খুব কাঁপছে! শৌভিক আমাকে তার বুকে টেনে নেয়। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আমাকে অভয় দিতে থাকে। আমি যখন তাকে জড়িয়ে ধরি, আমার শরীরটা ঝাকি দিয়ে উঠে। আমার চোখ বন্ধ হয়ে যায়। চোখ মেলে দেখি আমি কোল বালিসটা জড়িয়ে ধরে মেঝেতে শুয়ে আছি। আমি দ্রুত উঠে খাটের উপর বসি। বাইরে রোদ উঠেছে!

বেশ বেলা হয়েছে।

আমি এতো সময় যা দেখেছি তা নিছক স্বপ্ন ছিল!

সবকিছু মিথ্যা হলেও তবে এ কথা সত্য যে, আমি ঘামে ভিজে গেছি কারণ আমার মাথার উপরের যে ফ্যানটি আছে সেটি অলস ভাবে বসে বসে আমার কর্ম কান্ড দেখছে। খুব সম্ভাবত বেশ কিছুক্ষণ পূর্বেই বিদ্যুত চলে গেছে। আমার আম্মুও খুব ডাকাডাকি করছেন।(কিশোরী কন্যা)

এখন বেলা ন’টা বাজে!

ব্যাসিনের সামনে দাঁড়ি চোখে-মুখে পানি ছুড়ে মারি। ব্রাশে পেস্ট নিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে থাকি। তবে রাতের স্বপ্নটা এখনও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে হয় স্বপ্নের ঘোর থেকে এখনও জাগে উঠতে পারিনি!

শৌভিক ভাইয়া ইতোমধ্যে তনুকে পড়াতে আরম্ভ করেছেন। তিনি তনুর লেখা

খাতার মধ্যে যেন লাঙ্গল চালাচ্ছেন। এরমধ্যে আমি খাটের উপরে দক্ষিণ পার্শ্বে

বসে পড়ি। ভাইয়া আমাদের দু’জনের মধ্যে বসেছেন।(কিশোরী কন্যা)

দুপুরে অনেক দিন পরে একসাথে আহার করছি। তনু আজগে শৌভিক ভাইয়ার পাশে বসেছে। খাওয়ার মধ্যে সে নানা রকমের কথা বলে চলছে। আব্বু তাকে বার বার থামতে বলছেন। তিনি আব্বুর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘মামা, আন্টির রান্নাটা আসলেও অসাধারণ! আমি এ খাবারগুলো খুব

মিস করি।’

আম্মু ভাইয়ার প্লেটে আর একটু ঝোল তরকারি তুলে দিচ্ছেন।

বিকেলে আম্মুর হাতের কফি খেয়ে ভাইয়া ইউনিভারসিটিতে চলে যান।

তনু বেশ কিছু সময় ভাইয়ার লেজে লেজে ছিল যাতে তিনি ওকে ইউনিভারসিটিতে

নিয়ে যান। কিন্তু সে আম্মুর চোখের দিকে একবার তাকিয়ে তার জিদের কথা ভুলে যায়। সে তার ব্যর্থ প্রচেষ্টাকে ত্যাগ করে অন্য কাজে মনযোগ দেয়। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি বাসাতে আমার চুলগুলো দুলছে। মনটা যেন এই বাতাসে দুলে দুলে কোথাও মিশে যাচ্ছে। কেন যেন মনে হচ্ছে আমার পাশে কোনো ছেলে থাকলে ভালোই হত। সারা বিকেলটা গল্প করে কাটিয়ে দেওয়া যেত। মনে তো কত ইচ্ছেই জাগে! সব ইচ্ছে তো আর পূরণ হবার নয়, আর তাই আমার মন এই অপূর্ণ ইচ্ছের দিকেই বার বার ছুটতে থাকে।

শনিবার দুপুর!(কিশোরী কন্যা)

আমাদের স্কুলের টিকিন পিরিয়োড।

মন্টু মামার চটপটির দোকান ছাড়া তো আমাদের টিফিন ই শুদ্ধ হয় না।

1 thought on “কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৪”

  1. Pingback: কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৫ - Bongo Education

Leave a Comment