কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৬

(কিশোরী কন্যা)বাবা রাতে বাসায় ফিরে মাকে বললেন- ‘কাকি-মা মারা গেছেন! বাড়িতে যেতে হবে। ব্যাগ টা গুছিয়ে দাও। আর এই টাকাগুলো রাখো। আমার ফিরতে দু-এক দিন দেরি হতে পারে। প্রয়োজন হলে ব্যাংক থেকে টাকা উঠিয়ে নিয়ো।” বাবা ঘর থেকে বেরিয়ে আমাকে দরাজাটা লাগাতে বললেন। আমি দরজাটা বন্ধ করে আমার কক্ষে এসে বিছানায় বসে পড়ি। বুকটা যেন ধড়ফড় করছে!

কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৬
কিশোরী কন্যা – মাফিজুল ইসলাম পর্ব -২৬

(কিশোরী কন্যা)

মা বলেন, ‘বেশি কাক ডাকা ভালো নয়। বিপদের আবির্ভাব! দাদির মৃত্যুতেও যেন কাকের ঢাক থামছে না। আমার অবশ্য আমার মায়ের এ কথায় বিশ্বাস হচ্ছে না কারণ শহরে তো আর কাকের অভাব নেই। আর কাক থাকলে এটি ডাকবে এটাই তো স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু কাকের ঢাক যেন মাত্রা অতিক্রম করে ফেলছে দিন ভর ডাকছে!

আমি মাঝে মাঝে জানালার কাছে গিয়ে তাড়িয়ে দিয়ে আসি, আমি কক্ষে ফিরলে আবারও ডাকা আরম্ভ হয়। বড্ড কর্কশ ডাক। কানটা ঝালাফালা করে দিচ্ছে। আমি দু’হাত দিয়ে কান বন্ধ করে রাখি।

মঙ্গল বার। বাবা বাড়ি থেকে ফিরে এসছেন। আমি, আম্মু আর তনু অর্থাৎ আমরা আপাতত ড্রইং রুমে বসে আছি। বাবা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে এসে ছোফায় বসে বড় একটা হাই তুলে বলেন,

“খোদা তাকে জান্নাত নসিব করুন। অনেক বড় হায়াত পেয়েছেন। বাঁচার ইচ্ছা মিটিয়ে মরেছেন!’

বাবার কথা শুনে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, ‘বাঁচার ইচ্ছে হবে না কেন? প্রত্যেক(কিশোরী কন্যা)

মানুষ ই-তো বাঁচতে চায়। “বাঁচতে চায় সেটি ঠিক আছে। কিন্তু মানুষের জীবন যখন যন্ত্রণাদায়ক

হয় ওঠে তখন সে শুধু মৃত্যু কামনা করে। এটি মানুষের এক বন্ধ ধারণা যে সে কেবল মৃত্যুর মধ্যমেই এই পার্থিব্য দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা ইত্যাদি ইত্যাদি থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে। তবে মৃত্যুর পরেও যে একটি জগৎ রয়েছে, সে জগৎ সম্পর্কে সে খুব বেশি অবগত নয়!’

“তাহলে মৃত্যু কোন সমাধান নয়! “এক্স্যাটলি!”

মাঝ দুপুরে ঠিক পূর্বে আমাদের ফোনে শৌভিক ভাইয়ার ফোন এসেছে। আমি পূর্বে কখনো তাঁর ফোন রিসিভ করতাম না। তবে আজ মনের ঝোকে ফোনটি রিসিভ করি।

‘হ্যালো, কে বলছেন প্লিজ?’

‘হ্যালো… হ্যালো… সাহানা, আন্টি কোথায়? আমি শৌভিক। আন্টি কে একটু দাও তো।’

“কেন খুব ব্যস্ত নাকি?…নাকি… আমাদের সাথে কথা বলা যাবে না! ‘না… না…! তুমি কিছু বলবে??

‘না, কিছু বলব না। এমনি তে মজা করলাম। আম্মু গোসল করছেন। ‘ঠিক আছে তাহলে আন্টিকে বলবে আমি শুক্রবারে বাড়ি যাব তাই – বৃহস্পতি বার দুপুরে আমি তোমাদের বাসায় আসছি। বৃহস্পতি বার তোমাদের ওখানে থেকে শুক্রবার রওনা হব…।’

সেই শুক্রবার থেকে আজ অব্দি তিন তিনটি শুক্রবার চলে গেল।(কিশোরী কন্যা) শুক্রবারে কলিং কেলটি বাজলে অথবা কেউ দরজার কড়ায় আঘাত করলে, আমার মনের মধ্যে চমকে উঠে যে – এই বুঝি শৌভিক ভাইয়া এসেছেন। শৌভিক ভাইয়ার আম্মা হয়ত তাঁরই অপেক্ষায় আছেন।

আমার অংক খাতার অসমাপ্ত অংকগুলো হয়ত তাঁরই অপেক্ষায় রয়েছে। সে যে আর আমাদের মাঝে কিছুতেই ফিরে আসবে না, তা মেনে নেওয়া তো দূরের কথা বিশ্বাস করতেই বড় কষ্ট হচ্ছে!

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল করেছে, স্লোগান দিচ্ছে কিন্তু সেখানে যেন শূণ্যতা রয়েছে। ঐ মিছিলে ভিড়ের মধ্যে আমি আর কখন শৌভিক ভাইয়া কে তিনি আর আসবেন না তাঁর বন্ধুদের আড্ডার মাঝে!

দেখতে পাব না। তিনি আজ আর নেই।(কিশোরী কন্যা)

হয়ত, ডিপার্টমেন্টের সামনে তাঁর জন্য একটি শোক বার্তা লিখে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটিও হয়ত কিছু দিন পর নামিয়ে রাখা হবে। কিংবা নামিয়ে না রাখা হলেও রোদ-বৃষ্টিতে পঁচে-শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাবে, এটি ই বাস্তবতা। তিনি আর আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন না!

কিসব ভাবতে ভাবতে সন্ধ্যার আজান পড়ে যায়।(কিশোরী কন্যা)

চারিদিকে কুসুম অন্ধকার!

আমি আজও বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে পাই দূরে বেশ কয়েকটি নতুন দালান মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আমার ভিরতটা যেন ছটফট করছে। বারান্দায় দাঁড়িয়েও যেন শান্তি পাচ্ছি না। আমার চারপাশের পরিবেশটা যেন বিমর্ষ আর রুক্ষ মনে হচ্ছে।

মধ্যরাত!

ডাইনিং টেবিলে কাছে যাই। পানি ভর্তি গ্লাসটা হাতে তুলে নেই। ঢকঢকিয়ে দু’গ্লাস পানি পান করি। একবার বারান্দায় যাচ্ছি আবার কক্ষে ঢুকছি! পরানটা খুব ছটফট করছে। কার জন্য যেন আজ পরাণটা পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে তাও বুঝছি না!

বেঁচে থাকাটা যেন বড়ই নিরর্থক মনে হচ্ছে।

সইতে পারছি নে! আবারও বারান্দায় যাই, বারান্দা থেকে আবার (কিশোরী কন্যা)আমার কক্ষে আসি।

পড়ারর টেবিলে বসি

টেবিল ল্যাম্পটি বার বার জ্বালাচ্ছি আর নিভাচ্ছি। হঠাৎ টেবিলের পার্শ্বে রাখা শুকনো ফুলগুলোর দিকে নজর পড়ল। এগুলো শৌভিক ভাইয়ার কক্ষে ছিল। তিনি যখন আমাদের বাসা শেষবারের মত ত্যাগ করলেন তখন আমি এগুলো তাঁর কক্ষ থেকে সংগ্রহ করে ছিলাম। আমি ফুলগুলো হাতে তুলে নেই! নাক দিয়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস নেই।

চোখ দু’টো বন্ধ করি! আমি দেখতে পাচ্ছি- তাঁর মুখচ্ছবি!

আমি শুনতে পাচ্ছি, তাঁর কণ্ঠস্বর। সেই প্রতিদিনের মতো যেভাবে তিনি আমার সাথে কথা বলতেন, মনেহচ্ছে তিনি আজও আমার সাথে কথা বলছেন। তাঁর সকল(কিশোরী কন্যা) কথাগুলো যেন এখনও আমার কক্ষের এখানে সেখানে ভেসে আছে। আমার এই রিক্ত হৃদয় কেবল তাঁরই স্মৃতিতে বিভোর হয়ে আছে। তাঁর সেই অম্লান হাসি, সরল-সহজ দৃষ্টি সবকিছুই চিরদিন রক্ষিত থাকবে আমার হৃদয়ে।

-সমাপ্ত

Leave a Comment